Language:
Facebook

Search

উপন্যাস

  • Share this:
উপন্যাস

বাংলা সাহিত্যের একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে বাংলা উপন্যাস। বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সূচনা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে হলেও উপন্যাস বা গদ্যসাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ উনিশ শতকের প্রথমার্ধের আগে ঘটেনি। ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে সংঘাত, মুদ্রণশিল্পের ক্রমোন্নতি, আধুনিক নগরসভ্যতার বিকাশ এবং মধ্যবিত্ত পাঠকবৃন্দের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে বাংলা উপন্যাসের বিকাশও ত্বরান্বিত হয়। "উপন্যাস" শব্দটির উৎস "উপনয়" ও "উপন্যস্ত" শব্দ দুটি।

অন্নদাশঙ্কর ও লীলা রায়ের মতে, উনিশ শতকের মধ্যভাগে যখন বাংলা ভাষায় উপন্যাস সাহিত্যের উদ্ভব ঘটে, তখন এই প্রকরণটি যেমন নতুন ছিল, তেমনই যে গদ্যভাষায় তা লেখা হয় তাও ছিল নতুন। উপন্যাসের ধর্মনিরপেক্ষ সুরটিও ধর্মকেন্দ্রিক দেশের প্রেক্ষাপটে নতুনত্বের স্বাদ এনেছিল। আবার যে সমাজে এবং যে সমাজের জন্য তা লেখা হয়েছিল, তাও ছিল সম্পূর্ণ নতুন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ঔপন্যাসিকের হাতে বিশ শতকের প্রথমার্ধের মধ্যেই এই নতুন প্রকরণটি পরিণত হয় এক সমৃদ্ধ ও সমুন্নত সাহিত্যধারায়। ব্রিটিশ শাসনকালে উপন্যাস রচনার ধারা কেন্দ্রীভূত ছিল কলকাতা শহরকে ঘিরে। ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গের পরে তদনীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) ঔপন্যাসিকেরা তাঁদের নিজস্ব পরিচয়টিকে তুলে ধরেন ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও রীতিনীতির উৎস একই হলেও, দেশভাগের ফলে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সাহিত্যের দুটি পৃথক ধারার উৎপত্তি ঘটে।

পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাস সাহিত্যের ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে যান অন্নদাশঙ্কর রায়, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, সুবোধ ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, আশাপূর্ণা দেবী, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সাবিত্রী রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সন্তোষকুমার ঘোষ, ননী ভৌমিক, বিমল কর, গৌরকিশোর ঘোষ, রমাপদ চৌধুরী, সমরেশ বসু, গুণময় মান্না, মহাশ্বেতা দেবী, অসীম রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, প্রফুল্ল রায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, দেবেশ রায় প্রমুখ। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিকদের মধ্যে আছেন হুমায়ূন আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জহির রায়হান, হুমায়ূন আজাদ, হাসান আজিজুল হক, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ প্রমুখ।

বাংলা উপন্যাসের উৎপত্তি


বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস রচনার চেষ্টা করেছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩) ও কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০-১৮৭০)। টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে প্যারীচাঁদ মিত্র রচনা করেন প্রথম বাংলা উপন্যাস আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮)। বাংলার সমাজের একটি কাহিনি বর্ণনা করতে তিনি যে চলিত ভাষা ব্যবহার করেন, তা মুদ্রিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ছিল অভূতপূর্ব। তবে বঙ্কিমচন্দ্র যে অর্থে ঔপন্যাসিক, প্যারীচাঁদ ঠিক সেই ধরনের উপন্যাস রচনা করেননি।

আলালের ঘরের দুলাল প্রকাশিত হওয়ার আগেও একাধিক গদ্যরচনার মধ্যে উপন্যাসের উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই প্রসঙ্গে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নববাবুবিলাস (১৮২৫) ও হ্যানা ক্যাথরিন মুলেন্সের ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) গ্রন্থ দুটির নাম উল্লেখযোগ্য। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য ও সার্থক উপন্যাস। মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম উপন্যাস রত্নবতী প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ সালে। প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক ছিলেন স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২)। তিনি দীপনির্ব্বাণ (১৮৭০) উপন্যাসটির জন্য সমধিক পরিচিত।

বিশ শতকের বাংলা উপন্যাস


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি বাংলা সাহিত্যের সকল শাখাকে ঋদ্ধ করেছেন, তার হাতেও উপন্যাস নতুন মাত্রা লাভ করেছে যদিও সমালোচকরা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসকে রসোত্তীর্ণ মনে করেন না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর আরেকজন প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক, যিনি উপন্যাসের জন্য দেশীয় সমাজ-সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেছেন। তবে এরা সবাই মানুষের ওপর তলের ওপর দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

১৯৮০’র দশকে হুমায়ূন আহমেদের সবল উপস্থিতি অনুভূত হওয়ার আগে বাংলা উপন্যাসের অধিক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিকদের অবদান ছিল সংকীর্ণ। এ সময়কার কয়েকজন প্রধান লেখক হলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, রমাপদ চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। তবে সত্তর দশক পর্যন্ত অজ্ঞাত ছিল বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কবি জীবনানন্দ দাশের অনন্যসাধারণ উপন্যাসসমূহের অস্তিত্বের খবর। তিনি ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে ২২টি উপন্যাস রচনা করেছিলেন।

বাংলা উপন্যাস নতুন মাত্রা লাভ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ গুপ্ত ও কমলকুমার মজুমদারের হাতে। এদের হাতে উপন্যাস বড় মাপের পরিবর্তে মানবিক অস্তিত্বের নানা দিকের ওপর আলোকপাত করে বিকশিত হয়। বস্তুত রবীন্দ্রপরবর্তী যুগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্ভবত সবচেয়ে কুশলী উপন্যাস শিল্পী। তারই পদাঙ্কানুসরণে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিকশিত হতে দেখা যায়। এরা উপন্যাসকে ব্যবহার করেছেন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক জটিলতার ওপর নিবিড় আলোকপাতের উদ্দেশ্যে। তাদের হাতে উপন্যাসে শিল্পশৈলীতে সঞ্চারিত হয়েছে দৃঢ় গদ্যের সক্ষমতা। মানবীয় ও সামাজিক বিষয়ের বিচিত্র বিবেচনা উপন্যাসকে সাধারণ পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে গেছেন এবং একই সঙ্গে উপন্যাসের স্তরও উঁচু হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলা উপন্যাসে সম্পূর্ণ নতুন করণকৌশল নিয়ে আবির্ভূত হলেন বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বাংলা উপন্যাসকে নতুন খাতে প্রবাহিত করলেন। বাঙলা উপন্যাস দীর্ঘকাল পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিকদের হাতে পরিপুষ্ট হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ একাই শত বর্ষের খামতি পূরণ করে দিলেন। তার উপন্যাসের অবয়ব হলো সবজান্তা লেখকের বর্ণনার পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীদের মিথস্ক্রিয়া অর্থাৎ সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি ছোট এবং স্বল্প পরিসরে অনেক কথা বলার পদ্ধতি প্রবর্তন করলেন। হুমায়ূন আহমেদ দেখালেন যে ইউরোপীয় আদলের বাইরেও সফল, রসময় এবং শিল্পোত্তীর্ণ উপন্যাস লেখা সম্ভব।

একবিংশ শতাব্দীর বাংলা উপন্যাস


একবিংশ শতাব্দী শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগের উত্তরাধিকার বহন করে। এ সময় কিছু কিছু নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাসের স্বাক্ষর রেখেছেন কতিপয় লেখক। উত্তরআধুনিক ধ্যানধারণা অবলম্বন করেও লিখেছেন কেউ কেউ। তবে নতুন কোন ধারা প্রবল বেগে ধাবিত করার মতো নতুন কারো আবির্ভাব এখনো হয় নি। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে আবু ইসহাক, শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, জহির রায়হান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, নাসরিন জাহান, আনিসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, শহিদুল জহির প্রমুখ শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের সবল উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও অনকে নতুন নতুন ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব লক্ষ করা গেছে যদিও প্রচলিত রীতির বাইরে যাওয়ার শক্তিশালী হাতের দেখা পাওয়া যায় না। এ সময় দেবেশ রায় এবং হাসান আজিজুল হক উপন্যাসে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা।

বাংলাদেশী উপন্যাস


বাংলাদেশী উপন্যাস বলতে পূর্ববঙ্গের উপন্যাসকে বোঝানো হয়; আরো সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় যে ভারত বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের উপন্যাসকে দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ পূর্ববঙ্গের সাহিত্যে একটি বিভাজন রেখা হলেও এর মানে এই নয় যে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা পরবর্তী উপন্যাসকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করেছে, বরং ১৯৭১ এই জন্যে একটি বিভেদক রেখা যে স্বাধীন জাতিসত্তা পূর্ববঙ্গের লেখকদের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবান্বিত করেছে, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস এবং প্রাদেশিকতার পরিবর্তে স্থলাভিষিক্ত হয়েছে বৈশ্বিকতা। এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষার বিস্তার, প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ এবং হুমাযূন আহমেদের মতো যুগস্রষ্টা কথাশিল্পীর আবির্ভাব।

বাংলায় উপন্যাস রচনা শুরু হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পর থেকে বাংলাদেশে উপন্যাস লেখা হয় (প্রথম বাংলা উপন্যাস 'আলালের ঘরে দুলাল', প্রকাশকাল ১৮৫৮ আর 'আনোয়ারা' প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে)। গত এই ১০০ বছরের সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশে অনেক মানসম্মত ঔপন্যাসিক এসেছেন।

Ayon Rahman Holud

Ayon Rahman Holud